ভূমিকা
আমাদের নিজ নিজ বিদ্যাশাখার দৃষ্টিকোণ থেকে মানবপ্রজাতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড—সহিংসতা ও যুদ্ধ—সম্পর্কে কথা বলা আমাদের দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করে; বিজ্ঞান যে মানবসংস্কৃতিরই একটি সৃষ্টি এবং তাই চূড়ান্ত বা সর্বাঙ্গীণ হতে পারে না, তা স্বীকার করে; আর সেভিলের কর্তৃপক্ষ ও স্পেনের ইউনেস্কো-সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে; আমরা, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানশাখার নিম্নস্বাক্ষরকারী গবেষকেরা, সমবেত হয়ে সহিংসতা সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিবৃতিতে উপনীত হয়েছি। এতে আমরা এমন কয়েকটি কথিত জৈবিক গবেষণা-ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছি, যেগুলো আমাদের নিজ নিজ শাস্ত্রের কিছু ব্যক্তিও সহিংসতা ও যুদ্ধকে ন্যায্য প্রতিপন্ন করতে ব্যবহার করেছেন। এসব কথিত গবেষণা-ফলাফল আমাদের সময়ে হতাশাবাদের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে, আমরা মনে করি এই ভ্রান্ত দাবিগুলোকে প্রকাশ্যে ও সুচিন্তিতভাবে প্রত্যাখ্যান করা আন্তর্জাতিক শান্তিবর্ষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সহিংসতা ও যুদ্ধকে ন্যায্য প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের অপব্যবহার নতুন নয়; আধুনিক বিজ্ঞানের আবির্ভাবের সময় থেকেই এমন অপব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন, বিবর্তন তত্ত্বকে শুধু যুদ্ধই নয়, গণহত্যা, উপনিবেশবাদ এবং দুর্বলদের ওপর নিপীড়নের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে।
আমরা পাঁচটি প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আমাদের অবস্থান প্রকাশ করছি। আমরা জানি, সহিংসতা ও যুদ্ধ সম্পর্কে আরও অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলো আমাদের নিজ নিজ শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে ফলপ্রসূভাবে আলোচনা করা সম্ভব; কিন্তু এখানে আমরা নিজেদের আলোচনাকে এমন একটি প্রথম পদক্ষেপেই সীমাবদ্ধ রাখছি, যেটিকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।
প্রথম প্রতিপাদ্য
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই দাবি ভুল যে, আমরা আমাদের প্রাণী-পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে যুদ্ধ করার প্রবণতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। প্রাণীজগতের বহু প্রজাতিতে লড়াই ব্যাপকভাবে দেখা গেলেও, প্রাকৃতিক অবস্থায় বসবাসকারী একই প্রজাতির সংগঠিত দলগুলোর মধ্যে ধ্বংসাত্মক লড়াইয়ের মাত্র অল্প কয়েকটি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে; এবং এর কোনোটিতেই বিশেষভাবে অস্ত্র হিসেবে তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়নি। অন্য প্রজাতির প্রাণী শিকার করে স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণকে একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে সহিংসতার সমতুল্য বলা যায় না। যুদ্ধ মানুষের একটি স্বতন্ত্র ঘটনা; অন্য প্রাণীদের মধ্যে তা ঘটে না।
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধের ধরন যে এত আমূল বদলেছে, তা দেখায় যে যুদ্ধ সংস্কৃতির সৃষ্টি। যুদ্ধের সঙ্গে জীববিজ্ঞানের সম্পর্ক প্রধানত ভাষার মাধ্যমে: ভাষা দলগুলোর সমন্বিত কার্যকলাপ, প্রযুক্তির হস্তান্তর এবং সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। জৈবিকভাবে যুদ্ধ সম্ভব, কিন্তু অনিবার্য নয়; সময় ও স্থানভেদে যুদ্ধ সংঘটনের হার ও প্রকৃতির তারতম্যই তার প্রমাণ। কিছু সংস্কৃতি শত শত বছর ধরে যুদ্ধে অংশ নেয়নি; আবার কিছু সংস্কৃতি কোনো কোনো সময় ঘন ঘন যুদ্ধে জড়িয়েছে, কিন্তু অন্য সময়ে নয়।
দ্বিতীয় প্রতিপাদ্য
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই দাবি ভুল যে, যুদ্ধ বা অন্য কোনো সহিংস আচরণ আমাদের মানবপ্রকৃতিতে জিনগতভাবে পূর্বনির্ধারিত। স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপের সব স্তরেই জিনের ভূমিকা থাকলেও, সেগুলো বিকাশের সম্ভাবনা প্রদান করে, যা কেবল বাস্তুতাত্ত্বিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হতে পারে। ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতার প্রভাব গ্রহণের পূর্বপ্রবণতা ভিন্ন হলেও, মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ধারিত হয় তার জিনগত উত্তরাধিকার ও লালন-পালনের পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়ায়। বিরল রোগগত অবস্থা ছাড়া জিন এমন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করে না, যে অবধারিতভাবেই সহিংসতার প্রতি প্রবণ হবে। তেমনি, এর বিপরীত প্রবণতাও জিন নির্ধারণ করে না। আমাদের আচরণগত সক্ষমতা গঠনে জিনেরও ভূমিকা আছে, কিন্তু জিন একা আচরণের চূড়ান্ত ফল নির্দিষ্ট করে দেয় না।
তৃতীয় প্রতিপাদ্য
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই দাবি ভুল যে, মানববিবর্তনের ধারায় অন্য ধরনের আচরণের তুলনায় আক্রমণাত্মক আচরণের পক্ষে বেশি নির্বাচন ঘটেছে। যথেষ্টভাবে অধ্যয়ন করা সব প্রজাতিতেই দলের মধ্যে কোনো সদস্যের মর্যাদা নির্ভর করে সহযোগিতা করার সক্ষমতার ওপর এবং দলের কাঠামোর জন্য প্রাসঙ্গিক সামাজিক ভূমিকা পালনের ওপর। ‘আধিপত্য’-এর সঙ্গে সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা জড়িত; এটি শুধু অধিক শারীরিক শক্তির অধিকারী হওয়া ও তা ব্যবহারের বিষয় নয়, যদিও এর সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণও জড়িত। প্রাণীদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের পক্ষে কৃত্রিম জিনগত নির্বাচন চালানো হলে দ্রুতই অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক প্রাণী তৈরি করা সম্ভব হয়েছে; এটি দেখায় যে প্রাকৃতিক অবস্থায় আক্রমণাত্মক আচরণের পক্ষে সর্বাধিক নির্বাচন ঘটেনি। পরীক্ষায় এভাবে তৈরি অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক প্রাণীদের কোনো সামাজিক দলে রাখা হলে তারা হয় সেই দলের সামাজিক কাঠামো ভেঙে দেয়, নয়তো দল থেকে বিতাড়িত হয়। সহিংসতা আমাদের বিবর্তনীয় উত্তরাধিকারের মধ্যে নেই, আমাদের জিনের মধ্যেও নেই।
চতুর্থ প্রতিপাদ্য
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই দাবি ভুল যে, মানুষের একটি ‘সহিংস মস্তিষ্ক’ আছে। সহিংস আচরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় স্নায়বিক ব্যবস্থা আমাদের থাকলেও, অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক উদ্দীপনায় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয় না। অন্যান্য প্রাণীর বিপরীতে, উচ্চতর প্রাইমেটদের মতো আমাদের উচ্চতর স্নায়বিক প্রক্রিয়া কোনো উদ্দীপনার প্রতিক্রিয়ায় কাজ করার আগেই তা ছেঁকে দেখে। আমরা কীভাবে কাজ করি, তা গড়ে ওঠে আমাদের অর্জিত শর্তায়ন ও সামাজিকীকরণের মাধ্যমে। আমাদের স্নায়ুশারীরবৃত্তে এমন কিছু নেই, যা আমাদের সহিংসভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করে।
পঞ্চম প্রতিপাদ্য
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই দাবি ভুল যে, যুদ্ধের কারণ ‘সহজাত প্রবৃত্তি’ অথবা অন্য কোনো একক প্রেরণা। আধুনিক যুদ্ধের উত্থান ছিল এক অভিযাত্রা—আবেগগত ও প্রেরণাগত উপাদানের (যেগুলোকে কখনো কখনো ‘সহজাত প্রবৃত্তি’ বলা হয়) প্রাধান্য থেকে জ্ঞানগত উপাদানের প্রাধান্যের দিকে। আধুনিক যুদ্ধে আনুগত্য, সহজে প্রভাবিত হওয়া ও আদর্শবাদিতার মতো ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য; ভাষার মতো সামাজিক দক্ষতা; এবং ব্যয় হিসাব, পরিকল্পনা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো যুক্তিনির্ভর বিবেচনাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজে লাগানো হয়। আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি প্রকৃত যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন তৈরির প্রস্তুতি—উভয় ক্ষেত্রেই সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যগুলোকে অতিরঞ্জিত করেছে। এই অতিরঞ্জনের ফলে মানুষ প্রায়ই এসব বৈশিষ্ট্যকে পুরো প্রক্রিয়ার ফলের বদলে কারণ বলে ভুল করে।
উপসংহার
আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি যে জীববিজ্ঞান মানবজাতিকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে না এবং মানুষ জৈবিক নিরাশাবাদের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই আন্তর্জাতিক শান্তিবর্ষে ও আগামীর বছরগুলোতে প্রয়োজনীয় রূপান্তরমূলক কাজগুলো হাতে নিতে পারে। এসব কাজ প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক ও সমষ্টিগত হলেও, সেগুলো প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর চেতনার ওপরও নির্ভর করে; তাঁদের জন্য নিরাশাবাদ ও আশাবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেমন ‘যুদ্ধের সূচনা মানুষের মনে’, তেমনি শান্তির সূচনাও আমাদের মনে। যে প্রজাতি যুদ্ধ উদ্ভাবন করেছে, সেই প্রজাতি শান্তিও উদ্ভাবন করতে সক্ষম। এই দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
সেভিল, ১৬ মে ১৯৮৬